শুরুতে হ্যারি পটার বইটি কেউ ছাপতেই চায়নিঃ জে কে রাউলিং

জে কে রাউলিং ‘হ্যারি পটার’ সিরিজের জন্য বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। তাঁর জন্ম ইংল্যান্ডে, ১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই। আসুন জেনে নেওয়া যাক তার সফলতার পেছনের কিছু গল্পঃ

jk rowling

ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা। ইংল্যান্ডের এক গ্রামে থাকে বাবা, মা আর তাঁদের ছোট্ট দুটি মেয়ে। বড় বোনের কাছে ছোট বোনের আবদারের শেষ নেই, গল্প না শোনালে সে ঘুমাতেই চায় না। কিন্তু রোজ রোজ নতুন গল্প কোথায় পাওয়া যায়! উপায় না দেখে বড় বোন মনের মাধুরী মিশিয়ে মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করে। সেই বড় বোনটি আজ পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় গল্পকার—হ্যারি পটারের লেখক জে কে রাউলিং।
ছোটবেলায় আর ১০ জন ছেলেমেয়ের মতো খেলাধুলার প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না রাউলিংয়ের। ভারি লাজুকধরনের মেয়ে ছিলেন তিনি, চুপচাপ বসে বসে পড়তেই বেশি ভালোবাসতেন। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি চলে যান লন্ডনে। সেখানে গিয়ে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, সেক্রেটারি হওয়া তাঁর কাজ নয়, তিনি নাকি প্রচণ্ড অগোছাল আর অমনোযোগী! হবেই বা না কেন, মিটিংয়ের সময় যখন চটপট নোট নেওয়ার কথা, তখন যে তাঁর মাথায় নতুন গল্পের আইডিয়া খেলে বেড়ায়। সেক্রেটারি হওয়ার আশা ছেড়ে তিনি ঠিক করেন ইংরেজির শিক্ষক হবেন। ইংল্যান্ড ছেড়ে পর্তুগালে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক পর্তুগিজ সাংবাদিকের। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করেন তাঁরা, সন্তানও হয় তাঁদের। কিন্তু মেয়ের জন্মের চার মাসের মাথাতেই রাউলিং ও তাঁর স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাউলিং দেশে ফিরে আসেন।
শুরু হয় রাউলিংয়ের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের অধ্যায়। সংসার ভেঙে গেছে, কোলে ছোট্ট মেয়ে, একটি চাকরি পর্যন্ত নেই। সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে মা-মেয়ের বেঁচে থাকা। তীব্র অনিশ্চয়তায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে সেই ভয়াবহ হতাশার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি আত্মহত্যা করার কথাও ভেবেছিলাম। শুধু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে পেরে উঠিনি। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমি নিজেকে সামলে নিই। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার নিজের এই অবস্থা হলে মেয়েকে মানুষ করতে পারব না। অতঃপর নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বদলে আমি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, নয় মাস ধরে একজন কাউন্সিলরের কাছে চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে।’
স্কটল্যান্ডের এডিনবরার এক ক্যাফেতে বসে তিনি একটু একটু করে লেখালেখি শুরু করেন। বহুদিন আগে ম্যানচেস্টার থেকে ট্রেনে লন্ডনে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় একটি গল্পের চিন্তা এসেছিল—এক ছোট্ট ছেলের কাহিনি, যে ট্রেনে চড়ে জাদুকরদের এক স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছে। সেই ছেলে আর কেউ নয়, হ্যারি পটার। ১৯৯৫ সালে রাউলিং হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার’স স্টোন বইটি লেখা শেষ করেন আর কয়েকজন এজেন্টকে বইয়ের পাণ্ডুলিপি পাঠান। মজার বিষয় হলো, শুরুতে কোনো প্রকাশক বইটি ছাপতেই রাজি হয়নি। বড় বড় অনেক প্রকাশক পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। টানা এক বছর ধরে চেষ্টার পর একজন প্রকাশক পাওয়া যায়। তা-ও সম্ভব হয়েছিল সেই প্রকাশকের আট বছর বয়সী মেয়ের কারণে, যে বইটি দারুণ পছন্দ করেছিল। বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অগ্রিম সম্মানী হিসেবে রাউলিংকে দেড় হাজার পাউন্ড দেওয়া হয়। প্রথম প্রকাশে ছাপা হয়েছিল মাত্র এক হাজার কপি, যার মধ্যে ৫০০ কপিই বিক্রি করা হয়েছিল বিভিন্ন স্কুলের লাইব্রেরির কাছে। হ্যারি পটারের প্রথম সংস্করণের সেই বইগুলো আজ পৃথিবীজুড়ে সংগ্রাহকদের কাছে এক অমূল্য, দুষ্প্রাপ্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয়, আর প্রতিটি বইয়ের বর্তমান দাম বেশি নয়, মাত্র ২৫ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকা)।
১৯৯৮ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে রাউলিং তাঁর প্রথম দুটি বইয়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বত্ব বিক্রি করে দেন, এরপর আর কখনো অর্থাভাবে পড়তে হয়নি তাঁকে। হ্যারি পটার সিরিজের বইগুলো একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করে। প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে সব রেকর্ড ভেঙে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অব ফায়ার বইটি প্রকাশ হওয়ার প্রথম দিনেই যুক্তরাজ্যে বিক্রি হয় প্রায় তিন লাখ কপি, আর দুদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয় ৩০ লাখ কপিরও বেশি!
সাফল্যের শিখরে উঠলেও নিজের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর স্মৃতি ভুলে যাননি রাউলিং। ২০০০ সালে তিনি একটি দাতব্য ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন, যা দুস্থ নারী ও শিশুদের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ডের মতো সহায়তা প্রদান করে থাকে।

তথ্যসূত্র: ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ যুক্তরাজ্যভিত্তিক পত্রিকা ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন অঞ্জলি সরকার

প্রথম আলোর স্বপ্ন নিয়েতে পূর্বে প্রকাশিত

 

পোষ্টটি লিখেছেন: লেখাপড়া বিডি ডেস্ক

লেখাপড়া বিডি ডেস্ক এই ব্লগে 990 টি পোষ্ট লিখেছেন .

লেখাপড়া বিডি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা বিষয়ক বাংলা কমিউনিটি ব্লগ।

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *