প্যারাডক্সিক্যাল জিডিপি

প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ বইটি তরুণ পাঠকদের মনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বেস্ট সেলারের তালিকায় রয়েছে। আমিও অনলাইন থেকে অর্ডার করে কিনে পড়ছি। আমার লেখার শিরোনাম থেকে বিভ্রম হওয়াই স্বাভাবিক কথা। কেননা জিডিপি কি করে প্যারাডক্সিক্যাল হয়? গেল মার্চের শেষ সপ্তাহের একটি দৈনিকের পরপর তিনটি সংখ্যার মতামত কলামের উপর বেশ গুরুত্ব দিলাম। আমার সহধর্মিনীকে বলেছিলাম এই তিনটি সংখ্যা যত্ন করে রেখে দিও, আমি আবার পড়ব। এই লেখা যখন লেখছি তখন (২রা এপ্রিল ২০১৯খ্রি., রাত ৯.০০ টা), আজকের পত্রিকাও দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। এতেও একটি মতামত কলাম দেখলাম।


আমি যা লিখছি তার বিশেষত্ব হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি নিয়ে। যদিও আমি অর্থনীতির অ-আ-ক-খ কিছুই বুঝিনা। আমার সহধর্মিনী অবশ্য বলেন যে, অর্থনীতি বেশ ভাল বুঝেন। এসএসসি তে ৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একাই অর্থনীতি নিয়ে পড়েছেন।


পত্রিকাটিতে ধারাবাহিক লেখালেখির কারণ হলো গত ১৯ শে মার্চ বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের(এনইসি) সভা শেষে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে আনুমানিক ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর পরই মূলতঃ হইচই চলছে। কেননা, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ব্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড হবে, যদি অর্থমন্ত্রীর কথা ফলে যায়। একটি দৈনিকের প্রধান বার্তা সম্পাদক শওকত ওসমান জিডিপির আলোচনায় যোগ করেছেন “প্রবৃদ্ধির বিভ্রম বনাম সুখ” শিরোনাম দিয়ে। যাতে তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রবৃদ্ধিতে সুখ আসছে কিনা তার একটি তুলনামূলক নিবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষনার কথা বলা হয়েছে তা হলো গত ৪০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আয়ের দশমিক ১ শতাংশ মানুষ প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছে। আর এরা হলো যারা রাজনীতিবিদদের অর্থায়ন করেন। তারাই অর্থনীতির অগ্রাধিকারগুলো ঠিক করে নেয়।


সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো প্রখ্যাত সাময়িকী “দ্যা ইকোনোমিষ্ট” এর তথ্য উপাত্ত মতে ১২৫ দেশের মধ্যে ৪৩ দেশ তাদের আয় বাড়লেও সুখ বাড়েনা, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জিডিপি বাড়লেও সুখের সূচকে ১০ ধাপ পিঁছিয়েছে। প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্য নিয়ে মতামত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। বাংলাদেশের আয় বৈষম্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ একটি উচ্চ আয় বৈষম্যেও দেশে পরিনত হওয়ার উপক্রম। কেননা, সম্প্রতি প্রকাশিত The World Ultra Wealth Report 2018 মোতাবেক ২০১২ সাল থেকে ২০১৭- এই কয়েকদিনে ধনকুবেরের সংখ্যা প্রবৃদ্ধির হারে বিশ্বে এক নম্বরে বাংলাদেশ।

ড. মইনুল ইসলামের মতামতের শিরোনাম ছিলো, “আমরা যেখানে শিখতে পারি।” তিনি ভিয়েতনামকে উদাহরণ টেনে এনেছেন তার লেখায়। কেননা, ভিয়েতনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পর বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে আজকের বিশ্বে চমকপ্রদ অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। পোশাক শিল্প, কফি, চাল প্রভৃতি সহ আরো উৎপাদন ও রপ্তানী ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছিই থাকে। পরের সংখ্যায় জনঘনত্ব মতামতে একটি দৈনিকের সহকারী সম্পাদক ও সাহিত্যিক মশিউল আলম লেখায় শিরোনাম দিয়েছেন “সস্তা মানুষের দেশে উন্নয়ন”। বুঝতে পারছেন তিনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন(জেট্রো) জরিপে ১৯ টি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশে যেখানে জাপানের বিনিয়োগ রয়েছে, তাদের মজুরি ও বেতনের তুলনামূলক চিত্র হলো বাংলাদেশের শ্রমিকের আয় ১০৯ মার্কিন ডলার। ভারতে ২৬৫, ভিয়েতনামে ২২৭ ও কম্বোডিয়ায় ২০১ মার্কিন ডলার।
জেট্রোর জরিপ মতে, জাপানে যে পন্য উৎপাদন করতে খরচ পড়ে ১০০ ইউএস ডলার সেটি বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ ৫১ ডলারে।
বাংলাদেশের শ্রম কি তাহলে এত সস্তা?


এতো আলোচনার পিছনে রহস্য কি? রহস্য একটাই অর্থমন্ত্রীর সম্প্রতি একটি অভিমত।বাংলাদেশ চলতি অর্থ বছরেই ৮.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে। আচ্ছা জিডিপি কি চুরি করা যায়? যে কোন রাষ্ট্র কি পরিসংখ্যানিক জিডিপি বাড়িয়ে বেশী দেখাতে পারে? এবিষয়টি ক্লিয়ার করার জন্য পাশের দেশ ভারতের দিকে একবার নজর দিয়ে আসি।


গত বছর মোদী সরকার বিগত ১৫ বছরের জিডিপির একটি সংশোধিত হিসেব করে দেখিয়েছে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের আমলে ঘোষিত ৭.৭ এবং ৮.৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রকৃত নয়, প্রকৃত হলো ৬.৭ শতাংশ। আর মোদী সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশ।এই সংশোধিত হিসেবই যদি আমলে আনি তাহলে আমরা বলবো জিডিপি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যাতে সরকারের সুনাম বৃদ্ধির জন্য কাজ করে।

 

আসলে জিডিপিটা কি? ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শেষ করছি। দুই অর্থনীতিবিদ প্যারিসের রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিলেন। সামনে একটি বস্তু দেখে দুজনের কেউই চিনতে পারেননি। হঠাৎ একজন বলে ফেললেন তুমি যদি এটা খেতে পারো তবে ১০০০ টাকা পাবে। অন্যজন রাজি হয়ে খেয়ে বুঝলেন বস্তুটি অখাদ্য। কিন্তু একাই খেয়ে ঠকবেন কেন? তাই অপর অর্থনীতিবিদকেও বললেন এবার তুমি যদি খাও আমিও ১০০০ টাকা দিবো। যেই কথা সেই কাজ, তিনিও খেলেন।দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তবে অর্থনীতিবিদ তো, দুজনে ১০০০ টাকা করে পকেটে পেয়েছি। বললেন যদিও খারাপ লাগছে তাতে কি, অসুস্থ মনে হচ্ছে তাতেও কি, এই যে দুই হাজার টাকা হাত বদল হলো, অর্থনীতিতে যুদ্ধ হলো এতে দেশের জিডিপি তো বাড়বে।


মার্কিন পরিবেশবিদ পল হওকেন বলেছেন, এখন আমরা ভবিষ্যৎ কে চুরি করে বর্তমানের কাছে বিক্রি করছি, আর এর নাম দিয়েছি জিডিপি।
উপরের সম্পূর্ণ লেখা একটি জাতীয় দৈনিকের বেশ কয়েকটি মতামত কলামের আলোকে রচিত।

-মোঃ খাইরুল ইসলাম।

পোষ্টটি লিখেছেন: Md. Khairul Islam

এই ব্লগে 7 টি পোষ্ট লিখেছেন .

মোঃ খাইরুল ইসলাম ইতিহাস বিভাগে অধ্যয়ন করেছেন ময়মনসিংহের প্রখ্যাত আনন্দ মোহন কলেজে। তিনি পড়ালেখা অবস্থায় লেখালেখির সাথে যুক্ত রয়েছেন। ফেসবুকে নানান ধরণের লেখালেখি করে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে বেশ ভালভাবেই যুক্ত রয়েছেন। ফেসবুক ব্যবহার করে সামাজিক উন্নয়নমূলক প্লাট ফর্ম তৈরি করেছেন। ঈদ্গাহ বন্ধু সমাজ(ইবিএস) সংগঠনের চীফ কোঅরডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পোশাক শিল্পে মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগে একটি কারখানায় সহ ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকুরী করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *