গল্প শিশির কণা লেখক মোঃ মশিউর রহমান

সদ্য এসএসসি পাস ছেলেটি । নাম শান্ত । নামের সাথে তার আচার ব্যবহারের একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায় । সে শহরের একটি নাম করা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে এবার । বাবা গ্রামে একটি প্রাইমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক । মা গৃহিনী । ছোট এক বোন এ বছর জেএসসি পরীক্ষা দিবে । সাজানো সংসার তাদের । শান্ত থাকে একটি মেসে । কয়েক জন বন্ধু মিলে একসাথে থাকে । গ্রামের স্কুলে পড়ার কারনে সর্বদা মা বাবার কাছে থাকায় সে কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার করত না । যদিও তার সাথের গ্রামের অনেক বন্ধুরাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করত । শহরে ভর্তি হওয়ায় যোগাযোগের জন্যে বাবা তাকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দিলেন । সে বাড়িতে মা বাবা ও ছোট বোনের সাথে ফোনে মাঝে মাঝে কথা বলত । এ পর্যন্তই ছিল তার মোবাইল ফোনের ব্যবহার । মেসে তার বন্ধুদের সেল ফোন ছিল দামী । তারা অনেকেই মোবাইল ফোনে ফেইসবুক ব্যবহার করত । শান্তর এ ব্যাপারে কোন ধারনা ছিল না । এসএসসি পর্যন্ত ছিল তার পাঠ্যবইয়ের জগৎ । শুধু পড়া আর পড়া । মা তাকে অনেক সময় বলতেন-
শান্ত, কতক্ষন বাহিরে বেড়িয়ে আয়
শান্ত বলত- মা আর একটু পড়ে নিই, কালতো স্কুলে পরীক্ষা আছে ।
তার স্যারদেরও তার সম্পর্কে ভাল ধারনা ছিল এসএসসি ফলাফল নিয়ে । শান্ত স্যারদের মানটা রেখেছে। গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে সে এসএসসি পাস করেছে । ফলে শহরের ভাল কলেজে ভর্তি হতে তার কোন বেগ পেতে হয়নি । একদিন তার মেসের এক বন্ধু সবুজ তাকে বলল
শান্ত, তুর কি ফেইসবুক আইডি আছে ?
ফেইসবুক কি? এটা কি কোন বই।
সবুজ হেসে বলল ধূর বোকা, এটাতো সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এটা মোবাইলেও ব্যবহার করা যায়।
আমার মোবাইলে একটা ফেইসবুক আইডি খুলে দে, দোস্ত।
ধূর বোকা, তুর সেটে ফেইসবুক একাউন্ট খোলা যাবে না। আরও ভাল মানের সেট কিনতে হবে।
সবুজ বিদেশ থেকে তার মামার পাঠানো দামী হ্যান্ড সেটে ফেইসবুক কি এবং এর ব্যবহার শান্তকে দেখাল। সে তার বান্ধবীদের সাথে কিভাবে চ্যাটিং করে তাও দেখাল। শান্তর খুব আগ্রহ সৃষ্টি হল। সে ভাবলো এটা তো দারুন ব্যাপার। সে মনে মনে ঠিক করল আগামী মাসে বাবা টাকা পাঠালে একটি ভাল মানের সেট কিনবে যাতে ফেইসবুক ব্যবহার করতে পারে। মাসের শেষের দিকে একদিন বাবা ফোন দিলেন –
শান্ত কবে টাকা লাগবে বলো?
বাবা এক সপ্তাহ পরে পাঠালেই হবে। সাথে আরো তিন হাজার টাকা বেশি পাঠাবে আমার প্রয়োজন আছে।
বাবার ধারনা হয়তো আরো স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়ছে।তার প্রয়োজন মত এক সপ্তাহ পড়ে টাকা পাঠালেন। টাকা পাওয়ার পর সাথে সাথেই তার বন্ধু সবুজকে নিয়ে একটি ভাল মানের হ্যান্ড সেট কিনে নিয়ে আসল। মেসে এসে সবুজ শান্তকে তার নতুন মোবাইল ফোনে একটি ফেইসবুক একাউন্ট খুলে দিল এবং এর ব্যবহার শিখিয়ে দিল। শান্ত পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই ফেইসবুক নিয়ে বসে। ইতিমধ্যে ফেইসবুকে তার অনেক বন্ধুও জুটেছে। সে একদিন রাতে পড়া শেষ করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফেইসবুকে ফ্রেন্ডস সার্চ করছে । হঠাৎ একটি আইডির মধ্যে তার চোখ পড়ল। নাম শিশির কনা। প্রোফাইলে দেখল তেমন কোন তথ্য নেই। ছবির অপশনে গিয়ে দেখল কিছু সুন্দর সুন্দর দৃশ্যের ছবি। সে বুঝতে পারল না এটা কি কোন ছেলে না মেয়ের আইডি। সে এই আইডিতে রিকোয়েষ্ট পাঠাল। শিশির কনা এটা এসেপ্ট করল। আসলে এই আইডিটি ছিল একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি মেয়ের আইডি। সেও তার বান্ধবীদের প্ররোচনায় ফেইসবুকে একটি একাউন্ট খুলছে ছদ্ধ নামে। সে মাঝে মাঝে এই আইডি দিয়ে তার বান্ধবীদের সাথে চ্যাটিং করে। একদিন সে চ্যাটিং করছিল এমন সময় শান্ত তাকে কৌতুহল বশত জিজ্ঞেস করল-
কে আপনি?
আমি শিশির কনা।
মেয়েটি শান্তর প্রোফাইলে ছবি ও তথ্য দেখে বুঝে ফেলেছে ছেলেটি তার সমবয়সী। তাই মজা করার জন্যে আসল পরিচয় গোপন রেখে চ্যাটিং করছিল। এভাবে একদিন মেয়েটি বলে ফেলল সেও গ্রামের একটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি মেয়ে। পরিচয় শুধু এতটুকুই। ধীরে ধীরে শান্তর মেয়েটির প্রতি আকর্ষন বেড়ে যায়। সময় পেলেই সে চ্যাটিংয়ে বসে যায় মেয়েটির সাথে। একদিন শান্ত মেয়েটিকে বলে-
তুমার একটি ছবি ও ফোন নাম্বারটা দাও।
কেন?
তুমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।
ঠিক আছে, আগামী কাল পোষ্ট করব।
সত্যিই মেয়েটি ওয়াল পেপার থেকে বাছাই করে সুন্দর একটি মেয়ের ছবি ফেইসবুকে পোষ্ট করল। শান্ত ভাবল এটা আসলেই তার ছবি। ছবি দেখে শান্তর তার প্রতি আরো আকর্ষন বেড়ে গেল। এভাবেই বাড়তে লাগল শান্ত ও মেয়েটির বন্ধুত্বের ঘনিষ্টতা। সে মেসে খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম করছে। মা বাবার সাথে সময়মত যোগাযোগ করছে না। শুধু টাকার প্রয়োজন হলেই বাবাকে ফোন দিবে।এখন তার মায়েই তাকে মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন-
শান্ত কেমন আছিস বাবা?
ভাল আছি মা, খুবই ব্যস্থ পড়াশুনা নিয়ে।
ঠিক আছে স্বাস্থ্যের যত্ন নিস।
ঠিক আছে মা।
সামনে তার মিডটার্ম পরীক্ষা। তার পড়াশুনায় মনযোগ নেই। বিষয়টা তার বন্ধুরা উপলব্দি করেছে। তাকে একটু সতর্কও করেছে। সে কিছুই শুনেনি। একদিন তার বাবা মেসে এসে হাজির হলেন। বাবা তাকে দেখে খুবই অবাক হলেন তার স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখে। রাত জাগতে জাগতে শান্তর চেহারার অবস্থা অনেকটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে।সে রাতে মেয়েটির সাথে মোবাইল ফোনে প্রচুর কথা বলে।এটা তার একটি নেশা হয়ে গিয়েছে। কথা না বললে তার ভাল লাগেনা। এদিকে মেয়েটির অবস্থাও তাই। মা বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন ভাল পাত্র পেলে মেয়েটিকে বিয়ে দিবেন।মেয়েটি সুন্দরী হওয়ায় পাত্র পেতে বেগ পেতে হল না।বিয়েও ঠিক হয়ে গেল। আগামী সপ্তাহে বিয়ে।একদিন মেয়েটি শান্তকে বলল সে আর ফোনে কথা বলবে না। তার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। একথা শুনার পর শান্তর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।সে তাকে অনুরুধ করল বিয়েটা ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে।এর পরদিন শান্ত মেয়েটিকে ফোন দিয়ে দেখল ফোনটি বন্ধ। সারাদিন চেষ্টা করল সংযোগটি বিচ্ছিন্ন। মেয়েটির সাথে তার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমই ছিল এই ফোন নাম্বারটি। মানসিক ভাবে সে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুই ভাল লাগছে না তার। শুধু কান্না করছে আর কান্না করছে।তার বন্ধুরা বিষয়টা কিছু জানতো কিন্তু সে যে এত সিরিয়াস ছিল তা তারা জানতো না। তারা তাকে অনেক বুঝালো সে কিছুতেই শান্ত হল না। সারা রাত সে অস্বাভাবিক আচরন করল। পরদিন সকালে বন্ধুরা সবাই যে যার মত কলেজে চলে গেল। শান্ত রুমে একাই বসে রইল। দুপুরের দিকে শান্তর বাবা আসলেন শান্তকে দেখতে।দেখেই বুঝে ফেললেন মনে হয় শান্ত অসুস্থ।জিজ্ঞেস করলেন-
কিরে শান্ত অসুস্থ নাকি?
শান্ত কোন উত্তর দিল না। এরই মধ্যে বন্ধু সবুজ রুমে এসে হাজির। সে শান্তর বাবাকে ঘটনা খুলে বিস্তারিত বলল। বাবা তার কথা শুনে খুবই দুঃখ পেলেন এবং ব্যথিত হলেন। শান্তকে বললেন –
চল বাড়ি যাই।
শান্তকে নিয়ে তিনি বাড়ি আসলেন।মা ও তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। বাবার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনলেন। তাদের সেই শান্ত মোবাইল ফোন ও ফেইসবুকে নেশাগ্রস্থ।এখন চিকিৎসার দরকার। মা অঝোরে কাদঁলেন কতক্ষন শান্তকে জড়িয়ে ধরে। সপ্তাহ খানিক পরে শান্তর অবস্থা আরো খারাপ হল। সে মানসিক ভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে অস্বাভাবিক আচরন করতে লাগল। কারো সাথে ভাল আচরন করে না। বাবা একদিন শহরের তার এক বন্ধুর পরামর্শে শান্তকে এক মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার বিস্তারিত বিবরন শুনে তার বাবাকে বললেন তরুন প্রজন্মের জন্যে এই ফেইসবুক ও মোবাইল ফোনে অপরিনত বয়সে বিপরীত লিঙ্গের কারো প্রতি সম্পর্ক গড়ে উঠা একটা নেশার মত। এটাকে প্রাথমিক অবস্থায় নিয়ন্ত্রন না করলে পরে অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠে। ডাক্তার তাকে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ঔষদপত্র লিখে দিলেন। বাবা শান্তকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এখন শান্তর সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায় মা বাবা দুজনেই।

পোষ্টটি লিখেছেন: আব্দুস সামাদ আফিন্দী নাহিদ

আব্দুস সামাদ আফিন্দী নাহিদ এই ব্লগে 28 টি পোষ্ট লিখেছেন .

বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা বিষয়ক বাংলা কমিউনিটি ব্লগ সাইট "লেখাপড়া বিডি"র নিয়মিত পাঠক ও লেখক হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে নিয়োজিত আছেন। বর্তমানে জামালগঞ্জ সরকারি কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে লেখাপড়া করছেন। তিনি সবুজ বিডি ও স্বদেশ নিউজ দুইটি অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতায় নিয়োজিত আছেন।

আমদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন পেইজে লাইক দিন গ্রুপে যোগ দিন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *